দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চলে খাবার পানিতে আর্সেনিক ও সিসার উপস্থিতি বিপজ্জনক হারে বাড়ছে। এতে উপকূলজুড়ে সুপেয় পানির সংকট দিন দিন চরম আকার ধারণ করছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, ঘন ঘন সামুদ্রিক ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং ভঙ্গুর বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে লবণাক্ত পানি প্রবেশের কারণে বহু মিষ্টি পানির উৎস ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণসহ স্থানীয় বিকল্প উদ্যোগগুলো দিয়ে পুরো বছরের পানির চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ইউটিলিটিজ পলিসি-তে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই সংকটের উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। সাতক্ষীরার আশাশুনি, শ্যামনগর এবং খুলনার কয়রা, দাকোপ ও পাইকগাছা উপজেলার ৩৯টি ইউনিয়নে এ গবেষণা পরিচালিত হয়। এতে দেখা যায়, উপকূলীয় এসব উপজেলায় বছরের প্রায় সাড়ে চার মাস (৪.৬৫ মাস) নির্ভরযোগ্য কোনো পানির উৎস থাকে না। উপজেলার ভিত্তিতে হিসাব করলে, পাইকগাছায় বছরে গড়ে ৭.১৫ মাস এবং কয়রায় ২.৮৪ মাস সুপেয় পানির তীব্র সংকট থাকে।
গবেষণার তথ্যানুযায়ী, এসব এলাকার মাত্র ১৬ শতাংশ পরিবারের নিজস্ব খাবার পানির ব্যবস্থা রয়েছে। ফলস্বরূপ, প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবারে দূর-দূরান্ত থেকে পানি সংগ্রহের গুরুভার বহন করতে হয় নারী ও কিশোরীদের। শুধু তাই নয়, নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে তাদের মোট মাসিক আয়ের প্রায় ৪ শতাংশ অর্থ কেবল খাওয়ার পানি সংগ্রহের পেছনেই খরচ করতে হচ্ছে।
গবেষণায় পরীক্ষা করা নলকূপের পানিতে মোট দ্রবীভূত কঠিন পদার্থের (টিডিএস) গড় পরিমাণ পাওয়া গেছে প্রতি লিটারে ১,৭৩৩ মিলিগ্রাম এবং পুকুরের পানিতে ১,৩৩০ মিলিগ্রাম—যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রা (১,০০০ মিলিগ্রাম/লিটার)-র চেয়ে অনেক বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের যৌথ জরিপ অনুযায়ী, খুলনা বিভাগের ৬৩.২ শতাংশ মানুষের ব্যবহৃত পানির উৎসে ক্ষতিকর ‘ই-কোলাই’ ব্যাকটেরিয়া বিদ্যমান। আর বাসা-বাড়িতে পান করার মুহূর্তে এই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া গেছে ৯২.৯ শতাংশ মানুষের পানিতে।
এছাড়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) নিরাপত্তা সীমা (প্রতি লিটারে ১০ মাইক্রোগ্রাম) অতিক্রম করে খুলনা বিভাগের ১৭.৮ শতাংশ মানুষের ব্যবহৃত পানিতে আর্সেনিক পাওয়া গেছে। এমনকি বাংলাদেশের প্রচলিত শিথিল মানদণ্ড (প্রতি লিটারে ৫০ মাইক্রোগ্রাম) অনুযায়ীও ১০.৭ শতাংশ উৎসের পানি আর্সেনিকযুক্ত। নিরাপদ মানদণ্ড, পানির পর্যাপ্ততা এবং জীবাণুমুক্ততার সার্বিক শর্ত বিবেচনা করলে খুলনা বিভাগের মাত্র ১৮.২ শতাংশ মানুষ পুরোপুরি নিরাপদ খাবার পানির সুবিধা পাচ্ছেন।
আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা আনিছা বেগম জানান, বাড়ির আশপাশের নলকূপের পানি মারাত্মক লবণাক্ত ও আর্সেনিকযুক্ত হওয়ায় তা খাওয়ার অযোগ্য। ফলে প্রাত্যহিক রান্নাবান্না ও খাবার পানির জন্য দূরের পুকুরপাড়ে বসানো ফিল্টারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে পানি সংগ্রহ করতে হয়।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও বিষয়টির ভয়াবহতা নিশ্চিত করেছেন। প্রতাপনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাজী আবু দাউদ এবং গাবুরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জিএম মাসুদুল আলম জানান, ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও ইয়াসের পর বেড়িবাঁধ ভেঙে লোকালয়ে জোয়ারের পানি ঢোকার পর থেকেই মিষ্টি পানির উৎসগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পন্ড ফিল্টার বা বিকল্প যেসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য।
পানিবাহিত এ দূষণ এখন জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় হুমকি। আইসিডিডিআর,বি ও ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, আশাশুনি ও কয়রা উপজেলার ৪০ বছর বা তদূর্ধ্ব ১৫ হাজার ৪৭১ জন অধিবাসীর মধ্যে ২১.৬ শতাংশ মানুষ আগামী ১০ বছরের মধ্যে হৃদ্রোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন।
খাবার পানির এই সংকট কাটাতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়ার কথা জানিয়েছেন সাতক্ষীরা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জহিদ পারভেজ। তিনি জানান, উপকূলীয় অঞ্চলে পুকুর খনন, পিএসএফ, বায়োস্যান্ড ফিল্টার স্থাপন এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে ১০টি উপকূলীয় জেলার ৪৪টি উপজেলায় ২ লাখ ৬ হাজার ৮৭২টি বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ইউনিট স্থাপনের কাজ চলছে। তবে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি ধারণক্ষমতার অভাবে অনেক সুবিধা শতভাগ কাজে আসছে না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উপকূলে পানির এই সংকট এখন আর কেবল দৈনন্দিন ভোগান্তির বিষয় নয়; বরং তা মানুষের জীবন, জীবিকা ও বাসস্থানের টিকে থাকার লড়াইয়ের সাথে সরাসরি যুক্ত। বিচ্ছিন্ন বা সাময়িক প্রকল্প নয়, বরং নিয়মিত পানি পরীক্ষা, টেকসই অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সমন্বিত পরিকল্পনা ছাড়া এ সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সম্ভব নয়।
প্রিন্ট করুন ফটো কার্ড