আরিফুজ্জামান (টিপু), রাজৈর উপজেলা প্রতিনিধি
ইউরোপের দেশ ইতালিতে উন্নত ভবিষ্যতের স্বপ্নে ঘর ছেড়েছিলেন তরুণ তৌকির খন্দকার (২০)। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ পরিণত হয়েছে এক নির্মম দুঃস্বপ্নে। দালালদের খপ্পরে পড়ে লিবিয়ার মাফিয়া বন্দিশালায় জিম্মি হয়ে আছেন তিনি। ধাপে ধাপে ৫৫ লাখ টাকা পরিশোধ করার পরও মেলেনি মুক্তি; উল্টো তৌকিরকে জীবিত ফিরে পেতে আরও ২০ লাখ টাকা দাবি করছে দালাল চক্র। ছেলেকে ফিরে পেতে সব হারিয়ে এখন নিঃস্ব ও দিশেহারা পরিবারটি।
ঘটনাটি ঘটেছে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলার হরিদাসদী-মহেন্দ্ররদী ইউনিয়নের ভাটিয়ারকান্দা গ্রামে। ভুক্তভোগী তৌকির ওই গ্রামের দেলোয়ার খন্দকারের ছোট ছেলে।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ১৪ মাস আগে ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে তৌকিরের সঙ্গে ২৫ লাখ টাকার ‘বডি কন্ট্রাক্ট’ করে স্থানীয় মানব পাচারকারী দালাল চক্র। লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর চক্রটি চুক্তির সম্পূর্ণ ২৫ লাখ টাকা বুঝে নেয়। তবে এর পরপরই শুরু হয় তৌকিরের ওপর অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন।
নির্যাতনের ভয়াবহ ভিডিও ও ভয়েস মেসেজ তৌকিরের পরিবারকে পাঠিয়ে তাকে মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। ছেলেকে বাঁচাতে ধাপে ধাপে আরও ৩৫ লাখ টাকা দেয় পরিবার। কিন্তু মোট ৫৫ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পরও তাকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। বর্তমানে মাফিয়া ও দালাল চক্রটি তৌকিরকে ছাড়তে আরও ২০ লাখ টাকা দাবি করছে।
ঘটনার ভয়াবহতায় বাধ্য হয়ে ভুক্তভোগী পরিবার আদালতের শরণাপন্ন হয়েছে। মানব পাচারের অভিযোগে গত ৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে মাদারীপুর কোর্টে ৭ জনকে অভিযুক্ত করে একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলার প্রধান আসামিরা হলেন—
১. রায়হান মুন্সী (২৮), ২. জিয়া শেখ (২০), ৩. জালাল শেখ (৫০), ৪. তানজিল মুন্সি, ৫. আবুল হাওলাদার (৫০), ৬. রেহানা বেগম (৫০), এবং ৭. আবু মুন্সি (৫৫)।
মামলা দায়েরের পর রাজৈর থানা পুলিশ দ্রুত অভিযান চালিয়ে তিনজন আসামি—জিয়া শেখ, জালাল শেখ ও আবুল হাওলাদারকে গ্রেপ্তার করেছে।
ভুক্তভোগীর বাবা, দেলোয়ার খন্দকার বলেন, "১৪ মাস আগে দালালরা বাড়িতে এসে প্রলোভন দেখিয়ে ছেলেকে ইতালিতে নেওয়ার কথা বলে। আমরা সরল বিশ্বাসে ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে রাজি হই। কিন্তু লিবিয়ায় নিয়ে তারা টাকা নেওয়ার পরও থামেনি, ছেলের ওপর নির্মম নির্যাতন চালায়। নির্যাতনের ভিডিও দেখিয়ে আমাদের কাছ থেকে আরও ৩৫ লাখ টাকা নিয়েছে। এখন মোট ৫৫ লাখ টাকা হারিয়ে আমরা পথে বসেছি, অথচ ছেলেকে পাচ্ছি না। আমরা আমার সন্তানকে ফেরত চাই এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ চাই।"
এদিকে অভিযুক্ত জিয়া শেখের বাড়িতে খোঁজ নিলে তার মা ও চাচা মানব পাচারে যুক্ত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, জিয়া বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। তৌকিরের বাবা ঝামেলার পড়ার পর মীমাংসার জন্য জিয়ার কাছে এসেছিলেন এবং সে সূত্রেই সে অর্থ লেনদেনের সাথে যুক্ত হয়, কিন্তু সরাসরি পাচারের সাথে জড়িত নয়।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে রাজৈর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) শেখ আমিনুর ইসলাম জানান, "অভিযোগ পাওয়ার পর মাদারীপুর কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়েছে। ইতিমধ্যে মামলার এজাহারনামীয় তিন আসামিকে আমরা আটক করতে সক্ষম হয়েছি। ঘটনায় জড়িত অন্যান্য আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।"
প্রিন্ট করুন
ফটো কার্ড
এ জাতীয় আরো খবর..